শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০২৩

অভিসারের আয়োজন

 যে গ্রামে বৃষ্টি নামে না, মেঘবালিকারা ভেসে বেড়ায় আপন মনে। সন্ধ্যা নামে না, বিকেলের কোমল রোদ; ধূসর বিড়ালের মত ঝিমুনি দেয় ঘরের কোণে। কিশোর কুমারের মনের ময়ূরমহলের মত একটি ঘর বানিয়ে রেখেছি তোমার নামে। সেই গ্রামের কিশোরীরা সব বকুলমালা হাতে তোমার প্রতীক্ষায়, অভিসারের আয়োজনে। 

বৃহস্পতিবার, ২২ জুন, ২০২৩

জীবন নদীর খেলা...

পাড় ভাঙা গাঙে যে আর ডিঙি ভাসে না।
চর জাগা মরা গাঙে জোয়ার আসে না।।

জীবন নদীর এই তো খেলা
সকালে ভাসালে ভেলা
বাইতে হবে সারা বেলা । রে।।
তা না হলে তরী কারো পারে আসে না।
চর জাগা মরা গাঙে জোয়ার আসে না।।

আগে যাদের গেল দোলা 
তাদের মত পাল তোলা 
শিখে নে ও মন ভোলা। রে।।
চলে গেলে সময় সে তো ফিরে আসে না।
চর জাগা মরা গাঙে জোয়ার আসে না।।
__________________________________
শাহানী রমেশ।
13 হেলাতলা রোড 
খুলনা 9100
বাংলাদেশ।
লেখা: 11 may 2023
পোস্ট: 23 june 2023










পালের নাও

গাঁয়ের নামটি বেশ কাব্যিক- চুকনগর। এ গাঁয়ের আকেবাঁকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানান কবিতা আর গল্প । গ্রামটি অনেক পুরোনো। বুড়িভদ্রা নদীর তীরে এর বাজার। হাট বসে মঙ্গল আর শুক্রবার।

বাদামতলা থেকে একটু উত্তরপশ্চিমে হাঁটার পর ইট বিছানো পথটি নিয়ে যায় দিব্য পল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে। এরপর এই পথ কাঁচা ও পোড়ামাটির- নদীর তীর ঘেঁষে চলে যায় পালপাড়া হয়ে কেশবপুর। 

ফুটবল খেলার মাঠ, তেঁতুলতলা পেরিয়ে আসার পর নদীর তীরে আর যে বিষয়টি রাজীবের মন কেড়ে নিত তা হল অর্ধপোড়ো দোতলা বাড়ি। দীর্ঘদিন বসবাসের পর নির্মল স্যার বাড়িটি ছেড়ে অন্যত্র আস্তানা গাঁড়ার পর কিছুদিন খালি পড়ে থাকে। অশোক-পারুল দম্পতি তাদের দুই সন্তান নিয়ে এই বাড়িতেই ওঠে। বড় সন্তান রাজীব চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। মেয়েটির নাম ছোঁয়া- এখনও বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করে নি। 

গরমের দিন। রাজীবের এখন ঘুড়ি উড়ানোর সময়- বাতাসের বেগ না থাকায় তা পারছে না। পান চিবুতে চিবুতে কাঁথা সেলাই-রত পারুলের আঁচল নিয়ে খেলা করছিল ছোঁয়া। ঘুড়ি না উড়িয়ে বসে থাকা রাজীবের দিকে চোখ যেতেই মনে মনে ঘুড়িটির অধিকার নিয়ে নেয়। দৌড়ে গিয়ে ছো মেরে ঘুড়িটি নিয়ে পালায় ফুটবল খেলার মাঠের দিকে। হাটবার নয় বলে মাঠ পুরো ফাঁকা- ইচ্ছে হলেই যথেচ্ছা দৌড়ের সুগম সুযোগ। অন্য সময় হলে রাজীবও দৌড়ে গিয়ে ঘুড়িটি কেড়ে নিয়ে পিঠের উপর দুম দুম করে দু-ঘা বসিয়ে দিত। ছোঁয়া মায়ের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি, গড়াগড়ি শুরু করে দিলে- রাজীবকেই যেতে হত তাকে নিয়ে বাজারে, লজেন্স কিনে দিতে। এখন তা হল না। বাতাসের বেগ না থাকলে ঘুড়ির মূল্য কোথায়! তেঁতুলতলায় মন খারাপ করে বসে; নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবছে কী করা যায়। আর একজন কেউ এলে গুটি (মার্বেল) খেলা যেত। 

পালপাড়ার দিক থেকে হাড়িকুড়ি বোঝাই নৌকা একটি আসছে ধীরে ধীরে। পাল তোলা থাকলেও হাওয়ার সহযোগিতার অভাবে নাওটি যেন চলতেই চাইছে না। আচ্ছা এই নৌকাগুলো কোথায় যায়! শুনেছে, বুড়িভদ্রা ওদিকে গেছে খর্ণিয়া, ষোলগাতিয়া হয়ে নাকি খুলনাও যাওয়া যায়! ভাবনার মাঝে হঠাৎই ক্লাসের বই-এ পড়া একটি কবিতা ঢুকে পড়ে। যেন তার শৈশবের জীবন যাপনের কথা ভেবেই কবি লিখেছেন, 

পালের নাও পালের নাও পান খেয়ে যাও

ঘরে আছে ছোট বোনটি তারে নিয়ে যাও।...

পল্লীকবি জসীম উদ্দীন কবিতা লেখার বীজ সেই দিনই রোপন করে দিয়েছিলেন রাজীবের কোমল অন্তরে।

আজ চব্বিশ বছর পর সেই বুড়িভদ্রা আরও বুড়ি হয়েছে। দখলদারসহ অন্য অনেক অসচেতনার কারণে তার প্রবল জলধারা আজ রূপ নিয়েছে সামান্য জলরেখায়। তেঁতুলগাছটি কবে, কেন কাটা হল সে আক্ষেপ মনের মাঝে লুকিয়ে রেখে রাজীব ভাবে, মানুষের জীবনের কথা বলার মত কবিতা এখন কেউ কি লেখেন! ইট-বালি-পাথরের নগরসভ্যতা কি আমাদের কোমল হৃদয়ের অনুভবেও হানা দিচ্ছে? অনেকেই ভাল লেখেন জানি, তাদের লেখা পাঠ্যক্রমে স্থান পায় না কেন- শুধু কি কর্তৃপক্ষের সুনজরের অভাব- নাকি...! ভাবনার মোড় ঘুরে নিজের দিকে চলে আসে, আমারও তো একক কাব্যগ্রন্থ গোটা দশেক। এর একটা কবিতাও কি কারও জীবনের সাথে মিলে যায়, নাকি ভ্রান্ত সময়ে সাহিত্য নিয়ে বাড়াবাড়ি করছি? অন্য কোনও শিল্পমাধ্যমের আহ্বানে সাড়া দিতে ব্যর্থ হচ্ছি বা পিছে পড়ে যাচ্ছি না তো আমরা!

‐------------------------------------------------------‐---------

21-06-2023

শাহানী রমেশ।

13 হেলাতলা রোড

খুলনা, বাংলাদেশ।