সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৭

ভাঙা পেয়ালা
অথবা পূব জানালা...
© শাহানী রমেশ।

ছোট গল্পে চমক থাকতে হয়। সেই রকম চমকিত দিন আজ। শীতের কাল এখন বাংলায় -তবু শীতের আকাল। শীত না পড়লেও কুয়াশার মায়াজালের চমক আছে প্রকৃতি জুড়ে। এই রকম চমক লাগা বিকেলে রবিবাবু কফির পেয়ালা হাতে পূব-জানালায়।

সিঁথির বয়স তখন চোদ্দ। সামনের বাসার চুয়াল্লিশ বছর বয়েসী রবিবাবুকে কীভাবে ভালবেসে ফেলল বোঝা মুশকিল। স্ত্রী-বিয়োগের পর চল্লিশোর্ধ রবিবাবু এবাসায় এসে ওঠার পর; আসে-পাশে, সামনে-পিছে'র জানালা দিয়ে নানান মুখের উঁকিঝুঁকি নিয়মিত চলতে থাকে। এর মধ্যে পূব-জানালার যে নারীর শারীরিক গঠনশৈলীতে মুগ্ধ হয় রবিবাবু- তিনি সিঁথির মা। সিঁথির মা-ও সকরুণ নির্লজ্জভাবে রবিবাবুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। রচিত হয় অশ্লীল ভাল লাগার আবেশ।

কপট সহকর্মীদের স্তুতি আর এসেও না-আসা শীতের বেহায়াপনায় ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরেন রবিবাবু। অফিস থেকে ফিরেই রবিবাবু প্রতি বিকেলে বড় এক মগ চা বানিয়ে পূব-জানালায় গিয়ে বসেন। এ সময় সিঁথির মা-ও ছাদে চলে আসেন।
তিন তলার ছাদ। রবিবাবু থাকেন পাশের বাসার চার তলায়। রবিবাবুর পূব-জানালা; মানে সিঁথিদের পশ্চিম-বারান্দা। এই বারান্দায় প্রায় বিকেলেই দেখা মেলে ডুবন্ত সূর্যের গোলাপী আভা। এই গোলাপী আভা ছড়িয়ে যাবার অনেক আগে থেকেই আর-ও একটি গোলাপী স্বপ্ন প্রতিদিন পেখম মেলে। স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর নেশা ধরানো প্রজাপতির নাম সিঁথি। পড়ার ছলে চলে ছলাকলা... আঁধার নামা অবধি। সিঁথির লেখাপড়ি আর ছাদে ও'র মা-র পায়চারী। এভাবেই চলছিল...।
কয়েক মাস এভাবে চলার পর বাংলায় নেমে এল ফাগুনের দিন। বাংলার ফাগুন বড়ই বিচিত্র একটি মাস- জীবের শরীর-মনে নোংরা ইঙ্গিত জাগায়। এই নোংরা ইঙ্গিতের কারণে কিনা জানি না- সিঁথিও একটি বড় পেয়ালা নিয়ে বসেছে। বড় অথচ হালকা পেয়ালায় চা-কফি কিছু আছে কিনা বোঝা ভার। রবিবাবু যখন যেভাবে চায়ের কাপে চুমুক দেয় সিঁথি তা অনুকরণ করে। এই সময় বিচিত্র আর-ও একটি ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন জায়গা থেকে রবিবাবুর কিছু ফোন আসে। সিঁথির-ও ফোন আসা শুরু হল। অনুকরণের এই  চলচ্চিত্র রবিবাবুর সন্দেহের পর্দায় এসে পড়ল। বিষয়টি নিয়ে সিঁথির মা'র সাথে কথা বলা দরকার।
দরকারি সেই সুযোগ-ও এসে গেল। পাশের বাড়ির রফিক ভাইয়ের নাতনির জন্মদিন। বোঝা-ই যাচ্ছে, বিচিত্র নোংরা ফাগুন সিঁথির মা-কে নিয়ে এসেছে রবিবাবু মরমের কাছাকাছি।
নিমন্ত্রণ খেতে বসার সময় কৌশলে রবিবাবু-সিঁথির মা পাশাপাশি, কানাকানি। ইচ্ছে করে শাড়িতে দৈ ফেলে দেওয়া, খাওয়া রেখে শাড়ি ধু'তে যাওয়া, নিভৃতে কথা বলা -সবকিছু ঘটে গেল নাটকীয় দ্রুততায়।
পরের দিন বৈকালিক চা-চক্র। সিঁথির মা'র ছাদে অনুপস্থিতি দেখা গেলেও পেয়ালা হাতে সিঁথির বারান্দায় আসা যথারীতি। হঠাৎ বারান্দায় দেখা যায় সিঁথির মা'কে। সিঁথির হাত থেকে কাপ কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলাসহ আরো কিছু প্রতিক্রিয়া। সিঁথির মা এত কিছু করে ফেলবে বুঝতে পারে নি রবিবাবু। লজ্জা পাওয়ার মত অনুভূতি নিয়ে জানালা থেকে সরে এলেও কাঁপতে থাকে ভীতির আবেগে।

সিঁথিকে আর বারন্দায় দেখা যায় না। সিঁথির মা এখন নিজের বাড়ির ছাদ ছেড়ে রবিবাবুর বাসায় আসা শুরু করেছে। শরীর মনের বিনিময় আর কথার নকশী-কাঁথা বলা চলে 'নকশীকথা'। এই নকশীকথার সুতো জুড়লে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়। (১) নারীরা প্রথম প্রেম ভুলতে পারে না (২) সিঁথির প্রথম প্রেম রবিবাবু (৩) ভাঙা পেয়ালাটি সিঁথি খুব যতনে তুলে রেখে দিয়েছে। বলে রাখা দরকার, সেদিনের কাপ ছুঁড়ে দেওয়ার অপ্রীতিকর ঘটনায় সিঁথির মা'র রাগ কম ছিল না। কিন্তু নিয়তির কোন ইশারায় জানি না কাপটি খুব বেশি একটা আক্রান্ত হয় নি। নিমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে হাজির করা না গেলেও নিজেদের জন্যে দিব্যি ব্যবহার করা চলে।

শীতের মত কৃপণতা শুরু করেছে বৃষ্টিও। এবছর বৃষ্টি হয় নি বললেই চলে। গত চার বছর ক'দিন বৃষ্টিতে ভিজেছে রবিবাবু আর সিঁথির মা- হাতে গুনে বলে দিতে পারে। অন্যদিকে সিঁথির জীবনে সময় কোনও মাত্রা পায় নি। নীরবেই কেটে যায় চারটি বছর। ক্লাসের সেরা ছাত্রী সিঁথি ফেল করা শুরু করে। মাধ্যমিক ছেড়ে উচ্চমাধ্যমিকে উঠতে না পারলেও বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় তাকে। বিয়ের সময় একগাদা উপহারের সাথে ভাঙাপেয়ালাটিও সে নিয়ে যায় শ্বশুরবাড়ি। সিঁথির স্বামী এই একটি বিষয় নিয়ে রসিকতা করে বেশ মজা পায়- সিঁথিকে 'ভাঙা-পেয়ালা' বলে। ভাঙাপেয়ালা'র অর্থ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সিঁথি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বয়সের তারতম্যের কারণে সিঁথির সংসার সুখের হয় নি।

সিঁথির বিয়ের পর ও'র মা সংসারের ভারে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ায় রবিবাবুর সাথে তার মেলামেশা বন্ধ হয়ে যায়।

বছর ঘুরে আবার শ্রাবণ। এবার ক্লান্ত নয় সে। ঝরছে, ঝরেই চলেছে অবিরাম- যেন কোনও বিরহীর নীরব রোদন। এই রোদন দুঃখের না কি সুখের বোঝা মুশকিল। কিন্তু সিঁথি ঠিক-ই বোঝে তার  সুখের (না কি দুঃখের!) সংসারে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে এই শ্রাবণ। আবার নিভিয়ে-ও দিয়েছে। ভনিতা না করে সরাসরি বললে, সিঁথির সংসার সুখের হয় নি কিন্তু দুঃখের-ও রইল না... অন্ততঃ সিঁথি তা-ই মনে করে। কারণ, বেশিদিন সংসারের ঘানি টানতে হয় নি তাকে। সড়ক দুর্ঘটনায় ও'র স্বামী নিহত হয়েছে। বাবার বাড়ি ফেরার সময় সিঁথি কিছুই আনে নি শুধু ওই ভাঙাপেয়ালা ছাড়া। 
সিঁথি ফিরে আসার পর আবার সেই বৈকালিক চা চক্র...।

সংসারের ভার কিছুটা সিঁথি সামলে নেওয়াতে ও'র মা আবার রবিবাবুর কাছে যাওয়া-আসা শুরু করে। তবে এবার অন্য আকুতি। ... দেখ, আমি তোমার একাকীত্বে দুর্বল হয়ে তোমাকে সঙ্গ দিই। স্বামী, সন্তান, সংসার ছেড়ে তোমার সাথে এসে সংসার গড়া সম্ভব না। সিঁথির যে অবস্থা... সহ্য করার মত না। ও তোমাকে এখনও ভালবাসে- তুমি ও'কে গ্রহণ কর। ... রবিবাবু সিঁথির মা'র দীর্ঘ প্রভাষণে দুর্বল হয়- নিয়তির কী পরিহাস! এই পরিহাস মেনে নিয়ে রবিবাবু নতুন করে সংসার শুরু করে।

নতুন সংসার গড়ার মধ্যেও ঢুকে পড়ে ভাঙাপেয়ালা। ভাঙাপেয়ালা বলে খোঁটা দেওয়ার মত রসিকতা এখানেও শুনতে হয়। তবে একটি বিষয় সিঁথিকে সুখী করেছে- ভাঙা কাপে ও-কে চা খেতে (পান করতে) দেয় না। রবিবাবু নিজেই ভাঙা কাপে চা পান করে। মজা করে বলে, 'আমি ভাঙাপেয়ালা, আমার বৌ ভাঙ্গাপেয়ালা, এই দুনিয়া ভাঙাপেয়ালা... হা হা হা।

এত দিনে সিঁথি ভাঙাপেয়ালা'র অর্থ বুঝতে শিখেছে। বুঝতে শিখেছে আরও অনেক কিছু; দুঃখ-সুখ। এই বুঝতে পারার সুখ সংসারে দুঃখের আগুন জ্বেলে দিয়েছে। মা'য়ের বিশেষ কিছু পোশাক ভুল করে এ-বাড়িতে থেকে যাওয়ার অর্থ বুঝতে পারা, কাপ ভেঙে ফেলার মত মা'য়ের প্রতিক্রিয়া, রফিক সাহেবের নাতনীর জন্মদিনে মা'য়ের শাড়িতে দৈ পড়ে যাওয়া... সব কিছু মিলে; মা'য়ের ভালবাসা। হায় বিধাতা! সিঁথি বুঝতে পারে না- তার ভালবাসায় মা ভাগ বসিয়েছে নাকি মা'র ভালবাসা সে কেড়ে নিয়েছে!

বৈকালিক চা-চক্রে কিছু পরিবর্তন। সিঁথি নেই- না এ-বাসায়, ও-বাসার বারান্দায়-ও নয়। ও'র মা অনুতাপের আগুনে শুদ্ধ- ছাদে আর আসে না। পৃথিবী বদলে গেলেও একই আছে শুধু ভাঙাপেয়ালা- রবিবাবুর হাতে। সিঁথির আত্মহত্যার পর রবিবাবু আবার একা।

shahaniramesh@hotmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন